Breaking News
Home / অপরাধ / মংডুতে বর্মি বাহিনীর নির্যাতন বেড়ে গেছে শেয়ার করুন-

মংডুতে বর্মি বাহিনীর নির্যাতন বেড়ে গেছে শেয়ার করুন-

জাতিসঙ্ঘের সাবেক মহাসচিব কফি আনানের নেতৃত্বে গঠিত কমিশন গত শনিবার মংডুর বড়গজিরবিল গ্রাম পরিদর্শনের সময় রোহিঙ্গা নারী ও শিশুরা তাদের ওপর মিয়ানমার সেনাবাহিনীর সহিংসতা, গণহত্যা, ধর্ষণের প্রতিবাদে মানববন্ধন করেন। এ সময় তারা প্ল্যাকার্ড ও ব্যানারের মাধ্যমে তাদের ওপর বর্মি বাহিনীর নির্যাতনের চিত্র তুলে ধরেন। বর্মি সেনাবাহিনীর এই নৃশংসতা-বর্বরতার খবর আনান কমিশনের কাছে প্রকাশ হওয়ার বিষয়টিকে ভালোভাবে দেখছে না মিয়ানমার সরকার। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে মংডুর ময়ূতং গ্রামে দুই দিনের সেনা বন্দিদশা থেকে মুক্তিপ্রাপ্ত কয়েক শ’ রোহিঙ্গা মহিলাকে আবারো গ্রেফতার করেছে। কফি আনান ঘটনাস্থল ত্যাগ করার পর গ্রামের পুরুষদের সেনাবাহিনী ধরে নিয়ে গেছে।
এ দিকে রোহিঙ্গা মুসলমানদের এই অবস্থায় দেখা দিয়েছে খাদ্য সঙ্কট। ধর্ষিতা ও আহতরা পাচ্ছেন না চিকিৎসা ও ওষুধ। বিনা চিকিৎসায় ধুঁকে ধুঁকে মরছে মানুষ। সব মিলিয়ে মিয়ানমারের রোহিঙ্গা অধ্যুষিত জনপদ বিশেষ করে মংডু সেখানকার লোকদের জন্য নরকে পরিণত হয়েছে। বর্মি সৈন্যরা পুরুষদের না পেয়ে নারীদের ওপর চালায় পাশবিক নির্যাতন। পরে নারীদের ঘরের বাইরে নিয়ে এক স্থানে জড়ো করে বিবস্ত্র করে বসিয়ে রাখে। সৈন্যদের গুলিতে একের পর এক মৃত্যুর পাশাপাশি পরিবারের পুরুষ সদস্যদের ধরে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। জ্বালিয়ে দেয়া হচ্ছে ঘরবাড়ি। ঘরপোড়া আশ্রয়হীন নারী-শিশুরা খোলা আকাশের নিচে দিন কাটাচ্ছেন। আর রাতে শিশুদের কোলে নিয়ে মায়েরা লুকিয়ে থাকছেন জঙ্গলে।
গত বৃহস্পতিবার রাতে কিছু রোহিঙ্গা পরিবার জীবন বাঁচাতে নৌকায় নাফ নদী পাড়ি দেয়ার চেষ্টা করছিলেন। নৌকায় বেশির ভাগ আরোহী ছিল মহিলা ও শিশু। কিছু দূর আসার পর মিয়ানমার বর্ডার গার্ড পুলিশ নৌকা লক্ষ্য করে উপর্যুপরি গুলিবর্ষণ করে। এতে নৌকা উল্টে ও গুলিবিদ্ধ হয়ে মাঝ নদীতেই মারা যান রোহিঙ্গা নারী ও শিশুরা। গতকাল সোমবার সকালে মংডুর
বুড়াসিকদারপাড়া ঘাট ও অন্যান্য এলাকা থেকে ভাসমান অবস্থায় ১৪টি গুলিবৃদ্ধ লাশ উদ্ধার করেছেন এলাকবাসী। ওই গ্রামের রোহিঙ্গারা নাফ নদীর ওপারে মিয়ানমার জলসীমায় ব্যাপক খোঁজাখুঁজি করে ১৪টি লাশ উদ্ধার করে। নৌকাটির বেশির ভাগ যাত্রী মিয়ানমারের বড়গজিরবিল ও রাইম্মারবিল গ্রামের বাসিন্দা। টেকনাফে পালিয়ে আসা একাধিক রোহিঙ্গা জানান, কফি আনানের সফরের পর নির্যাতনের মাত্রা বাড়িয়ে দিয়েছে মিয়ানমার সেনারা।
তারা রাখাইন রাজ্যের জাম্বনিয়া, কেয়ারিপ্রাং, গজিরবিলসহ কয়েকটি গ্রাম থেকে পাঁচ শতাধিক লোককে আটক করে অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে গেছে। তারা আরো জানান, শনিবার ও রোববার রাতে ওই দু’টি গ্রামের শতাধিক বাড়িঘর জ্বালিয়ে দেয়া হয়। ধর্ষণের শিকার গৃহহারা নারী ও শিশুরা নাফ নদীর পাড়ে আশ্রয় নেন। গত রোববার রাতে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গাদের মধ্য থেকে কেউ কেউ নৌকায় বাংলাদেশে পালিয়ে আসার সময় এই দুর্ঘটনা ঘটে।
স্থানীয় জেলে সুমন জানিয়েছেন, নাফ নদীর মিয়ানমারের জলসীমায় একটি নৌকা ডুবে যেতে তারা দেখেছেন। ঘটনার পর সাঁতার কেটে বাংলাদেশের জলসীমায় আসতে দেখে তারা তিনজনকে উদ্ধার করে কূলে তোলেন। এই সময় রেহেনা বেগম নামে এক রোহিঙ্গা নারী সাঁতার কেটে বাংলাদেশের জলসীমার লালদিয়া দ্বীপে আশ্রয় নেন। গতকাল ভোরে বাংলাদেশী জেলেরা মুমূর্ষু অবস্থায় তাকে উদ্ধার করে এনজিও পরিচালিত স্থানীয় একটি হাসপাতালে ভর্তি করে। নাফ নদীর টেকনাফ প্রান্তের জাদিমুড়া নামক জায়গার বিপরীত দিকে বাংলাদেশী জেলেরা জানান, ডুবে যাওয়া নৌকায় ৩০-৩৫ জন রোহিঙ্গা ছিল। তাদের বেশির ভাগই নারী ও শিশু।
নাফ নদীর ওপারের বাসিন্দা এবং এপারে আশ্রয় নেয়াদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, মিয়ানমারের মংডুতে সে দেশের সেনাবাহিনীর তাণ্ডব থেকে বাঁচতে হাজারো রোহিঙ্গা শিশু, নারী ও পুরুষ নাফ নদীর ওপারে অবস্থান করছে।
মিয়ানমারে নির্যাতনের শিকার হয়ে পালিয়ে এসে কেয়ারী প্রাং গ্রামের (হুক্কাডা) চেয়ারম্যান নুর বশর প্রকাশ হাসু মিয়া। গত কয়েক মাস আগেও তিনি ছিলেন বিত্তশালী ও সচ্ছল। গ্রামে রয়েছে তার ৩০ বিঘার ওপর চাষাবাদের জমি। স্ত্রী, তিন ছেলে ও সাত মেয়ে।
গত অক্টোবরে বিজিবি ক্যাম্পে হামলার পর মিয়ানমার সেনাবাহিনী তার বাড়িঘর জ্বালিয়ে দিয়ে বাড়ির গরু-মহিষ নিয়ে যায়। এরপর নির্যাতনের ভয়ে তিনি পরিবারের সবাইকে নিয়ে আশ্রয় নেন টেকনাফের লেদা আনরেজিস্টার্ড রোহিঙ্গা ক্যাম্পের বি ব্লকে দূর সম্পর্কের আত্মীয় কলিম উল্লাহর ঘরে। তার ছেলেরা মিয়ানমারে ব্যবসায় করতেন। তার সাথে কথা হয় লেদা ক্যাম্পে। এ সময় তিনি মিয়ানমার বাহিনী ও বর্ডার পুলিশের নির্যাতনের বর্ণনা দেন। তিনি জানান, হুক্কাডা (গ্রাম চেয়ারম্যান) হিসেবে দায়িত্ব পালন করার কারণে অতীতে মিয়ানমার সরকারি বাহিনীর সাথে তার সুসম্পর্ক ছিল। কখনো নির্যাতনের শিকার হননি তিনি।
কিন্তু মিয়ানমার বাহিনীর এবারের অভিযান সম্পূর্ণ ব্যক্তিক্রমধর্মী। গ্রামের বাড়িঘরে নির্বিচারে আগুন ধরিয়ে দেয়া হয়। তার হিসাব মতে কেয়ারীপ্রাং গ্রামে দুই হাজার ২০০ মতো বাড়ি ছিল। সেনাবাহিনী গ্রামের অন্তত দুই হাজার বাড়ি জ্বালিয়ে দিয়েছে। এই গ্রামের প্রায় ১০ হাজারের মতো মানুষ আশ্রয়হীন হয়েছে বলে জানান তিনি। রাখাইনে কিভাবে শান্তি প্রতিষ্ঠা হতে পারে প্রশ্ন করা হলে তিনি জানান, রাখাইন রাজ্যে জাতিসঙ্ঘ শান্তি রক্ষীবাহিনী নিয়োগ করা হলে রোহিঙ্গারা শান্তিতে বসবাস করতে পারবে বলে মনে করেন তিনি। এ জন্য তিনি বিশ্বসম্প্রদায়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। কথা হয় একই গ্রামের অপর এক পল্লী চিকিৎসক ফজল আহমদের সাথে। তিনি গ্রামে পল্লী চিকিৎসা করে ভালোই থাকতেন। সমাজে বেশ সুনাম ছিল। গ্রামের মানুষ তাকে সমীহ করে চলত। আর্থিক অবস্থা ছিল সচ্ছল।
কিন্তু ১৩ অক্টোবর তাদের গ্রামে চলে অভিযান। সেনাবাহিনীর ভাষায় বাগী অর্থাৎ বিদ্রোহী খুঁজার নামে চলে বাড়িতে বাড়িতে অগ্নিসংযোগ, লুটপাট, ধর্ষণ ও হত্যা। অভিযানে কেয়ারীপ্রাং গ্রামের দুই শতাধিক লোককে হত্যা করা হয়েছে বলে জানান তিনি।
সেই গ্রামের অন্যদের সাথে পালানোর সময় হেলিকপ্টার থেকে রকেট লাঞ্চার নিক্ষেপে তিনি নিজেও আহত হয়েছেন। রকেট লাঞ্চারের স্লিপার এসে লাগে তার পায়ে। এখনো চিকিৎসা করাচ্ছেন তিনি। তিনি সপরিবারে বাংলাদেশে পালিয়ে আসেন।
টেকনাফের লেদা রোহিঙ্গা ক্যাম্পে আলাপকালে তিনি জানান, এখানে খুব কষ্ট করে দিন কাটছে। একটা ঘরে গাদাগাদি করে বসবাস করছেন। তিনি বাংলাদেশে থাকতে চান না। রাখাইন রাজ্যে নিজ বসত ভিটায় ফিরতে চান।
কিন্তু এ অবস্থায় ফিরলে নিশ্চিত মৃত্যু বলে জানান তিনি। তারও অভিমত রাখাইনে জাতিসঙ্ঘ শান্তিরক্ষী বাহিনী মোতায়েন করা হলে রোহিঙ্গারা নিজ ভূমিতে ফিরে যাবেন। এ ছাড়া মিয়ানমার সরকার যদি রোহিঙ্গাদের সে দেশের নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি দেয় তাহলে এ সমস্যা সমাধান হতে পারে বলে মনে করেন তিনি।
এ ছাড়া গজিরবিল এলাকার মাস্টার রশিদ, আইয়ুব, কুয়ারবিলের শামসুসহ অনেকের সাথে কথা বলে জানা গেছে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গারা স্বদেশে ফিরতে চান। নিজ মাতৃভূমিতে শান্তিতে বসবাস করতে গেলে জাতিসঙ্ঘ শান্তিরক্ষী ছাড়া এ মুহূর্তে তারা আর কোনো পথ দেখছেন না। এ দিকে টেকনাফের তিনটি সীমান্ত পয়েন্ট দিয়ে অনুপ্রবেশের চেষ্টাকালে রোহিঙ্গা ভর্তি চারটি নৌকা ফেরত পাঠিয়েছে বিজিবি। গতকাল ভোরে টেকনাফের নাফ নদীর তিনটি সীমান্ত পয়েন্ট দিয়ে এসব নৌকায় রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে অনুপ্রবেশের চেষ্টা করেছিল।
টেকনাফের বিজিবি-২ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লে. কর্নেল আবুজার আল জাহিদ জানান, ভোরে নাফ নদীর জাদিমুরা সীমান্তের তিনটি পয়েন্ট দিয়ে অনুপ্রবেশের চেষ্টাকালে জলসীমার শূন্যরেখা থেকে রোহিঙ্গাবোঝাই এ চারটি নৌকা ফেরত পাঠানো হয়। প্রতি নৌকায় ১০ জনের বেশি রোহিঙ্গা ছিল।রোহিঙ্গাদের অনুপ্রবেশ ঠেকাতে সীমান্তে বিজিবি কড়া নজরদারি অব্যাহত রেখেছে। গত ২১ নভেম্বর থেকে নাফ নদীর বিভিন্ন সীমান্ত পয়েন্ট দিয়ে রোহিঙ্গাদের বহনকারী ৯২টি নৌকা অনুপ্রবেশ চেষ্টাকালে ফিরিয়ে দেয়া হয়েছে।
এ দিকে উখিয়া (কক্সবাজার) সংবাদদাতা হুমায়ুন কবির জুশান জানান, সীমান্তে বিজিবি ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে আটক রোহিঙ্গাদের বিজিবির মাধ্যমে মিয়ানামারে ফেরত পাঠানো হলেও ওইসব রোহিঙ্গা ভিন্ন পথে আবার ফিরে আসছেন। এসব নির্যাতিত রোহিঙ্গারা কুতুপালং বস্তি অথবা ছড়িয়ে ছিটিয়ে অবস্থানরত তাদের স্বজনদের কাছে আশ্রয় নিতে সক্ষম হচ্ছেন। সম্প্রতি কুতুপালং বস্তিতে আশ্রয় নেয়া এমন কয়েকটি রোহিঙ্গা পরিবারের সাথে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।

About admin

Check Also

৫০০ শিশুকে ধর্ষণ করেছে এই নরপশু

১৩ বছর ধরে অন্তত ৫০০ শিশুকে ধর্ষণ করার অভিযোগে সুনীল রাস্তোগি নামে একজন সিরিয়াল রেপিস্টকে …

One comment

  1. It’s in reality a great and helpful piece of information. I am happy that you simply shared this useful
    information with us. Please stay us up to date like this. Thank you for sharing.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *