বাংলাদেশ

মেঘনা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সেবার মান উন্নত

মেঘনা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সেবার মান উন্নত করার কারিগর ডাক্তার মুহাম্মদ জালাল হোসেন
মেঘনা থেকে বিশেষ রিপোর্টঃ-
আর দশটা সরকারি হাসপাতালের মতোই ছিল কুমিল্লার মেঘনা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের পরিবেশ। ভেতরে-বাইরে নোংরা, অপরিচ্ছন্ন, দালালদের উৎপাত। সবার মধ্যে গা ছাড়া ভাব। এটা নেই, ওটা নেই। সেবার মান নিম্ন। এখন সেদিন বদলেছে। হাসপাতালের ভেতরে– বাইরে ঝকঝকে তকতকে। কোথাও ময়লা –আবর্জনা নেই। নেই কোনো দুর্গন্ধ। চিকিৎসক, কর্মকর্তা– কর্মচারী সবাই সময়মতো হাসপাতালে আসেন। সরকারি হাসপাতাল নিয়ে রোগীদের যে বিস্তর অভিযোগ, মেঘনা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এখন তা নেই। হাসপাতালের বাইরে থেকে যতটা না পরিচ্ছন্ন, ভেতরে ঢুকলে দৃষ্টি নিবদ্ধ হয় কিছু বিষয়ের ওপর। ভেতরে ঢুকলে মনে হয় দেশের বড় কোন প্রাইভেট হাসপাতালে প্রবেশ ঘটেছে। কমপ্লেক্সটির সার্বিক অবকাঠামোর সৌন্দর্য্য বৃদ্ধি, নিয়ম শৃঙ্খলার উন্নতি ও সেবার মান ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। বর্তমানে হাসপাতালের সেবা নিয়েও এলাকার মানুষ বেশ সন্তোষ্ট।

হাসপাতালটির আমূল এই পরিবর্তন এর নেপথ্য নায়ক স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডাঃ মোঃ জালাল হোসেন। গত ২০২০ সালের ০১ জানুয়ারি এখানে যোগদানের পরই এই স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের দৃশ্যপট পাল্টে দিয়েছেন তিনি।

সরেজমিনে গত ৯আগষ্ট সকালে হাসপাতাল চত্বরে ঢুকতেই চোখে পড়ল ছিমছাম সবুজ চত্বর। চিরচেনা আবর্জনার স্তূপ নেই। ময়লার ভাগাড় ছিল প্রবেশ সড়ক ঘেঁষে। তা এখন ফল-ফুল ও ঔষুধি গাছের বাগান। উৎকট গন্ধের বদলে বাতাসে ভেসে আসে ফুলের সুবাস। মূল ফটক থেকে ভবনের সামনের চত্বর এবং পিছনে বৈদ্যুতিক এবং সোলার বাতির আলোয় আলোকিত। ভবনে আউটডোরে দুটি টিকিট কাউন্টার। সামনে সেবাপ্রত্যাশী মানুষের ভিড়। দুই টিকিট বিক্রেতার দম ফেলার ফুরসত নেই। হেল্পডেস্কের সামনেও ভিড়। রোগীদের সুপেয় পানির সমস্যা নিরসনে বহির্বিভাগ, জরুরি বিভাগ ও অন্তঃবিভাগে আধুনিক ও মানসম্মত পানির ফিল্টার স্থাপন করা হয়েছে।

করোনা রোগীদের চিকিৎসাসেবা প্রদানের জন্য ২৯ শয্যা বিশিষ্ট ডেডিকেটেড কোভিড-১৯ ওয়ার্ডে সেন্ট্রাল অক্সিজেন, পালস অক্সিমিটার, কার্ডিয়াক মনিটর, নেবুলাইজার, সাকার মেশিন সহ বিভিন্ন প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি চালু করে করোনা রোগীদের সেবা নিশ্চিত করা হয়েছে এখানে।

অর্ন্তবিভাগের ওয়ার্ডে প্রবেশে বেশ কড়াকড়ি এখন। রোগীপ্রতি একজন দর্শনার্থী থাকতে পারেন। হাসপাতালে দালালদের দৃশ্যমান তৎপরতা নেই। নেই ওষুধ কোম্পানির লোকজনের অবাধ উপস্থিতিও। তাঁরা হাসপাতালে ঢুকতে পারেন সপ্তাহে তিন দিন, তা-ও বেলা একটার পরে। গোটা হাসপাতাল এলাকা সিসি ক্যামেরার আওতায় আনা হয়েছে। রয়েছে অগ্নিনির্বাপণযন্ত্র।

জানা যায়, ২০০৬ সালে প্রতিষ্টিত মেঘনা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটি অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়েও এখন রোগীরা আন্তরিকতাপূর্ণ সেবা পাচ্ছেন। ৫০ শয্যার স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে মোট ২৫ জন চিকিৎসক ও ২৩ জন সেবিকা(মিডওয়াইফ সহ) জরুরী ও বহির্বিভাগে নিয়মিত রোগীদের সেবা দিচ্ছেন। উপজেলায় দূর-দূরান্ত থেকে আসা প্রতিদিন কমবেশী প্রায় ৪০০ জন এবং জরুরী বিভাগে প্রায় ৮০ থেকে ৯০ জন রোগী সেবা নিয়ে থাকে। এছাড়াও অতিসম্প্রতি সিজারিয়ান অপারেশন শুরু হওয়ার পর প্রতিমাসে কমবেশী প্রায় ২০ থেকে ২৫টি সিজার অপারেশন করা হয় । নরমাল ডেলিভারী করা হয় প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ জন গর্ভবতী মায়ের । তাছাড়াও জ্ঞাত যে জরুরী প্রয়োজনের দিক বিবেচনায় ২৪ ঘন্টা হাসপাতালে ডেলিভারীর ব্যবস্থা চালু রয়েছে। হাসপাতালের রোগীর খাবার, পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা, সুবিধা-অসুবিধাসহ সার্বিক বিষয়ে নানামুখী সৃজনশীল কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। তাছাড়াও রাত অবধি এই কর্মকর্তাকে হাসপাতালের কর্মব্যস্থ সময় পার করতে দেখা যায়।

উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের একাধিক স্বাস্থ্যকর্মী জানান, এটি সৌন্দর্যবর্ধিত হাসপাতাল। জানামতে এমন সরকারি হাসপাতাল আর কোথাও নেই। উন্নত পরিবেশ পেলে রোগীদের অসুস্থতা কমে যায়। এই পরিবেশ ও সেবার কারণে রোগীর পরিমাণ বেড়েছে। আমরা ডাক্তাররাও অনেক ভালো সেবা দিতে চেষ্টা করছি। রোগীরাও নিয়ম মেনে হাসপাতালে সেবার জন্য আসছে। কিভাবে আরো সহজে প্রতিটি ইউনিয়ন, ওয়ার্ড ও গ্রাম পর্যায়ে সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিত করা যায় এ ব্যাপারে প্রতিনিয়ত সভা-সমাবেশের মাধ্যমে তাদের সঠিক দিক নির্দেশনা ও পরামর্শ প্রদান করেন। উন্নত চিকিৎসা ও সৌন্দর্যবর্ধনের জন্য স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের আমরা ধন্যবাদ জানাই।

কথা হয় উপজেলার চালিভাঙ্গা গ্রামের হাফেজ মাসুদ মিয়ার সাথে। তার স্ত্রী ও শালী হাসপাতালের মহিলা ওয়ার্ডে ভর্তি আছেন । তিনি বললেন, প্রয়োজনীয় ওষুধপথ্য হাসপাতাল থেকে পেয়েছেন। চিকিৎসক ও নার্সরা নিয়মিত আমার বাবাসহ সকল রোগীর খোঁজখবর নিচ্ছেন। হাসপাতালের মেঝে ও দেয়ালে টাইলস লাগানো চকচকে পরিবেশ, শৌচাগারও পরিচ্ছন্ন দেখে তিনি মুগ্ধ হয়েছেন বলেও জানান।

চিকিৎসা নিতে আসা হিমেল শিকদার বলেন, হাসপাতালটিতে এলে মনে হয় কোনো বেসরকারি হাসপাতালে এসেছি। আগে হাসপাতালে ডাক্তার ঔষধ চিকিৎসা কোনটাই ছিল না। এখন সুশৃঙ্খলভাবে ডাক্তার দেখানো যাচ্ছে। হাসপাতালে ঢুকলেই শরীরে একটা প্রশান্তি চলে আসে।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, এই স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ডাক্তার জালাল স্যার যোগদানের পর থেকে হাসপাতালে রোগীদের খাবার, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতাসহ নানামুখী সৃজনশীল কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। তাছাড়া রাত অবধি এই কর্মকর্তাকে হাসপাতালে কর্মব্যস্ত সময় পার করতেও দেখা গেছে। আসলে চিকিৎসকদের একটু দরদি স্পর্শ, একটু সহানুভূতি, একটু হাসিমাখা মুখের কথায় জটিল ও কঠিন ব্যাধিতে আক্রান্ত ব্যক্তিকেও আশাবাদী করে তুলে, রোগযন্ত্রণা ভুলিয়ে দেয়।

মেঘনা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা ডাঃ মোঃ জালাল হোসেন বলেন, মুজিব বর্ষের একটি স্লোগান ছিলো ‘”মুজিব বর্ষে স্বাস্থ্য খাত, এগিয়ে যাবে অনেক ধাপ।” এই স্লোগানের মাধ্যমে আমরা একটি পরিকল্পনা করি কীভাবে এই হাসপাতালের পরিবর্তন আনা যায়। একটা সময় হাসপাতালে ভালো কোনো চেয়ার-টেবিল ছিল না। ডাক্তারদের রুমের অবস্থাও ছিল একদম সাদামাটা। রোগীদের বসার জন্য চেয়ায় ছিল না। এখানে মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মানে আলাদা কেবিন করা হয়েছে। এ বিষয়ে আমি স্থানীয় সংসদ সদস্যের সঙ্গে কথা বলি। তিনি আমার সঙ্গে একমত হন এবং উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান যথেষ্ট সহযোগিতার হাত বাড়িয়েছেন।
তিনি আরো জানান, আমাকে পরামর্শ ও লজিষ্টিক সাপোর্টসহ নানাহভাবে সহযোগিতা করেছেন, মাননীয় এমপি মেজর জেনারেল (অবঃ) সুবিদ আলী ভূইয়া স্যার, সিভিল সার্জন ডাঃ মীর মোবারক হোসেন স্যার, উপজেলা চেয়ারম্যান আলহাজ্ব সাইফুল্লা মিয়া রতন শিকদারসহ স্থানীয় জনপ্রতিনিধিগণ।
আমি চাই মেঘনাবাসীর স্বাস্থ্য ব্যবস্থার আরো মানোন্নয়ন ও আধুনিকায়ন। যাতে এখানকার মানুষকে আরো অধিকতর, উন্নত ও মানসম্মত সেবা দিতে পারি।

উপজেলা চেয়ারম্যান আলহাজ্ব সাইফুল্লা মিয়া রতন শিকদার বলেন, বর্তমান সরকার শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও বাসস্থানসহ মানুষের মৌলিক অধিকার পূরণে বদ্ধ পরিকর। আমি চেয়ারম্যান হওয়ার পর মেঘনাবাসীর এই মৌলিক অধিকারগুলো বাস্তবায়নে কাজ করে যাচ্ছি। তারই ধারাবাহিকতায় স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটিকে স্বয়ংসম্পূর্ণ করতে চেষ্টা করেছি। এখন চিকিৎসা সেবা পেয়ে মেঘনা বাসী খুশি। আর কমিউনিটি ক্লিনিকসহ অন্যান্য সমস্যা গুলো মাননীয় এমপি মহোদয়ের সাথে আলোচনা করে অচিরেই সমাধানের চেষ্টা করবো ইনশাআল্লাহ।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button