খেলাধুলা

আজ থেকে শুরু হচ্ছে ফুটবল বিশ্বকাপ

আজ থেকে শুরু হচ্ছে অলিম্পিকের পর বিশ্বের
জনপ্রিয়তম ক্রীড়া প্রতিযোগিতা “ফুটবল বিশ্বকাপ “৷ ২০ নভেম্বর থেকে ১৮ ডিসেম্বর ২০২২ পর্যন্ত উপসাগরীয় ছোট অথচ ধনী দেশ কাতারে হচ্ছে এবারে বিশ্বকাপ ফুটবলের আসর ৷ মধ্যপ্রাচ্য তথা আরব দুনিয়ায় এই প্রথম এবং এশিয়ায় দ্বিতীয়বার বসছে এই প্রতিযোগিতা ৷ এবারেই শেষ ৩২ দলের মধ্যে খেলা হচ্ছে ৷ অত্যধিক গরমের দেশ বলে আয়োজক সংস্থা ফিফা গ্রীষ্ণের বদলে শীতকালে প্রথম বিশ্বকাপের আয়োজন করেছে ৷বিশ্বকাপে বিজয়ী ও বিজীত দল যথাক্রমে ৩১৮ এবং ২২৮ কোটি ভারতীয় টাকা পুরস্কার পাবে ৷তৃতীয় ও চতুর্থ দল পাবে ২০৫ এবং ১২৯ কোটি টাকা !
করোনা পরবর্তী বিশ্বে এই প্রথম এত বড় ক্রীড়া প্রতিযোগিতা হচ্ছে ৷ আজ ভারতীয় সময় রাত সাড়ে ন’টায় কাতার ও ইকুয়েডরের মধ্যে খেলা দিয়ে শুরু হচ্ছে ছবির “আল রিহালা ” নামের( যার বাংলা ভ্রমণ) আডিডাসের বলে ৷ বলের নিখুঁত গতিবিধি জানতে এর ভিতরে ৫০০ হার্জ আই এম ইউ সেন্সর প্রযুক্তি ব্যবহৃত চামড়ার এই বলে থাকছে বিশেষ ব্যবস্থা !এবার প্রথম বিশ্বকাপে ভিডিও এসিস্ট্যান্ট রেফারি থাকছে ৷এতে সেমিঅটোমেটেড অফসাইড প্রযুক্তি থাকছে ৷ ক্ষুদ্র দেশ কাতারের ৫৫ কিমি জায়গার মধ্যে ৫টি শহরের ৮টি স্টেডিয়ামে ৩২ টি দলের ৬৪টি খেলা হবে ৷ যেখানে দেড় মিলিয়ন দর্শক খেলা দেখতে পারবেন ৷ স্টেডিয়াম তৈরী ও নবীকরণে ৮৪ হাজার টন স্টিল লেগেছে ৷ থাকছে ৭০ হাজার আউট লাইট ৷ কাছে বলে দর্শকরা সহজে ইলেকট্রিক বাস ও মেট্রো লিঙ্কের মাধ্যমে বিভিন্ন স্টেডিয়ামে খেলা দেখতে পারবেন ৷বিশ্ব কাপে সর্বমোট ৫ বিলিয়ন অর্থনীতির আদান প্রদানের আশা ৷ এবারের বিশ্বকাপের ম্যাসকট স্কিলফুল ফুটবলার যাকে আরবী ভাষায় ” লাইব “বলে ৷ পোস্টার হচ্ছে কাতারের সাবেকি টুপি ‘আগাল” ৷মরুর মহোৎসবে মরু ঝড় হচ্ছে বিশ্বযুদ্ধ ৷ যেখানে সাদা , কালো , পীত একাকার হয়ে যাবে ৷ এবারে প্রথম ছেলেদের বিশ্বকাপে মহিলা রেফারিও খেলা পরিচালনা করবেন ৷ এবার ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডো ও লিওনেল মেসির শেষ বিশ্বকাপ ৷
প্রাগতৈহাসিক যুগ থেকে প্রতিকূল পরিবেশ ও পরিস্থিতির সঙ্গে অভিযোজনের অনুশীলন , অবসর বিনোদন এবং সামাজিক অভ্যাসের মাধ্যমে খেলাধূলার সূত্রপাত ৷তাই , প্রতিটি প্রাচীন সভ্যতার অঙ্গ ছিল খেলা ৷ যা থেকে তখনকার মানুষের রুচিবোধ ও সংস্কৃতির পরিচয় পাওয়া যায় ৷অনেকে মনে করেন শত্রুর ছিন্ন মস্তক পায়ে লাথালাথি দিয়ে ফুটবল খেলার শুরু ৷তবে ,পা দিয়ে মেরে হাওয়া ভরা গোল বল খেলাকে আমরা “ফুটবল” বলি ৷ এধরণের খেলার প্রচলন বিশ্বের নানা প্রান্তে হাজার হাজার বছর ধরে ৷ কারো দাবী এই খেলার সূত্রপাত গ্রিসে , কেউ বলেন প্রাচীন মিশরে আবার চীনের দাবীর পিছনেও রয়েছে যথেষ্ঠ যুক্তি ৷ ৩৮৮-৩১১ খ্রিস্ট পূর্বাব্দে এন্টিফেনাসের লেখা গ্রীক নাটক ‘ক্লিমেন্ট অফ আলেকজান্দ্রিয়া ‘ তে ‘এপিকাইরস ‘( Episkyros) নামের হাওয়া দিয়ে চামড়ার বেলুনাকৃতি একরকম খেলার উল্লেখ আছে ৷ তবে , এই বলটা ছিল অনেকটা রাগবি বলের মত ৷ প্রাচীন রোমেও ‘ হারপাসটাম’ ( Harpastum ) ওদের উচ্চারণে ‘হারপাসতু’ বলে এ ধরণের খেলার বিবরণ দিয়েছেন সেখানকার রাজনীতিক ‘সিসেরো ‘( ১০৬-৪৩ খ্রিঃপূঃ) ৷ তিনি লিখেছিলেন নাপিতের কাছে দাড়ি কামানোর সময় এক ব্যক্তি হারপাসটাম বলের আঘাতে মারা গিয়েছিলেন ৷ খ্রিঃপূঃ তৃতীয় থেকে প্রথম শতকে লেখা তৎকালীন চীনা সামরিক বিদ্যার গ্রন্থ ‘ ঝান গুয়ো সে ‘( Zhan Guo Ce) -তে ‘সু চু’ নামের চামড়ার গোলককে পায়ের লাথি মেরে খেলার কথা আছে ৷ শুধু তাই নয় হান সাম্রাজ্যের আমলে (২০৬-২২০ খ্রিস্টাব্দে) এই ‘সু চু” (Tsu Chu)খেলার নিয়ম প্রবর্তিত হয়েছিল ৷ এতে চামড়ার একটি বলকে ৩০ ফুটের দুটি পোলের মধ্যে টাঙানো সিল্কের গর্তের মধ্যে পাঠাতে হত ৷ সম্ভবত চীন থেকে এই খেলা জাপানে ‘কেমারি'( Kemari) নামে এবং কোরিয়াতে ‘চুক গুক'( Chuk – guk) নামে অনেকটা এক নিয়মে খেলা হত ৷ ৬০০ খ্রিস্টাব্দ নাগাদ জাপানে এই খেলাটি রাজদরবারে নিয়মিত হত ৷ ১৯০৩ সাল থেকে আবার জাপানে উৎসবে ও পর্যটকদের মাঝে এই খেলাটি পুনঃপ্রচলিত হয়েছে ৷এর ফুটবল মাঠটি ছিল বৃত্তাকার ৷ গ্রিনল্যান্ডে ইনউইট আদিবাসীরা এং নিউজিল্যান্ডের মাওরি আদিবাসীদের মধ্যেও একেকরকম পায়ে লাথি মেরে বল খেলা হত ৷ প্রত্যেক দলে সাত জন করে খেলোয়াড় থাকত ৷ মাঠের মাঝখানের বৃত্তে বল ঢোকানো মানে এখনকার পরিভাষায় গোল ৷ আমেরিকার রেড ইন্ডিয়ানরা পাথরের বল নিয়ে ফুটবল খেলত ৷ আলাস্কার এক্সিমোরা খেলত বরফের গোলা দিয়ে ৷ মাইনাস ৫০ ডিগ্রী তাপমাত্রায় এস্কিমোরা এই ‘একসাকটুক’ খেলত ৷যেমন পাটুলীতে আমরা ছোটবেলায় গোলাকৃতি কাগজ দিয়ে ফুটবলে হাতে থুরি পায়ে খড়ি দিয়েছি ৷ আজও সে আনন্দর তুলনা পাই না ৷অস্ট্রেলিয়ার আদিবাসীরা ‘ম্যান গ্রক’ নামে ফুটবল খেলত ৷ আধুনিক ফুটবলের মত অনেকটা খেলা শুরু হয় ইটালির ফ্লোরেন্স শহরে ‘ ক্যালসিয়ো স্টোরিকো ‘
( Calcio Storico) নামে ৷ এতে খেলোয়াড় থাকত ২৭ জন ৷যার মধ্যে গোলরক্ষক ৫ জন ৷ ইংল্যান্ডে এই সময় ‘মব ফুটবল'( Mob Football) নামে অসংখ্য খেলোয়াড় নিয়ে গায়ের জোর দেখানো একরকম ফুটবল হত বিভিন্ন ধর্মীয় ও সামাজিক অনুষ্ঠানে পাশাপাশি গ্রাম বা কাউন্টির মধ্যে ৷ ইংরেজি ‘ফুটবল’ শব্দে আমাদের এই ফুটবল ছাড়াও অনেকগুলিকে খেলাকে বোঝানো যায় ৷ যেমন – রাগবি , আমেরিকান ফুটবল , অস্ট্রেলিয়ান রুলস ফুটবল , গালিক ফুটবল ও কানাডিয়ান ফুটবল ৷ আমাদের প্রিয় ফুটবল যা বিশ্বের জনপ্রিয়তম খেলা ৷ যে বিশ্বকাপ অলিম্পিক ছাড়া সবচেয়ে জনপ্রিয় ১৯৫টি দেশে প্রচলিত সেই ফুটবলকে সঠিকভাবে বোঝাতে পৃথিবীর অনেকগুলি দেশ ‘সকার'( Soccer) কথাটি ব্যবহার করে ৷ ১৮৮০ সালে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা ‘er’ যোগ করে শব্দকে সংক্ষিপ্ত করত ৷ এভাবেই এসোসিয়েশন কথাটি বিকৃতভাবে হয় সকার ৷ যা প্রথম ব্যবহার করেন চার্লস রিফোর্ড ব্রাউন ৷মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র , কানাডা , নিউজিল্যান্ড , সামোয়া , মার্শাল আইল্যান্ডের মত দেশে ‘সকার ‘ নামটিই চলে ৷
অনেক কিছুর মতই আজকের আধুনিক ফুটবলের সূত্রপাত ১৮৬৩ সালে ইংল্যান্ডে ৷ বিখ্যাত কেম্ব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে তখনকার বিশিষ্ট মানুষ ও খেলোয়াড়গন মিলিত হয়ে আধুনিক ফুটবলের বিধিনিয়ম রচনা করেন ৷ ১৮৭০ সালের এই সভাই জানায় প্রতি দলে একজন গোলরক্ষক সহ ১১ জন করে খেলোয়াড় অংশ নেবে ৷ ঐ বছরেরই ৫ মার্চ নতুন নিয়মে ইংল্যান্ড ও স্কটল্যান্ডের মধ্যে খেলা দিয়ে আধুনিক ফুটবলের জয়যাত্রা শুরু হয় ৷১৮৭২ সালেই প্রথম আন্তর্জাতিক ফুটবল খেলা হয় ইংল্যান্ড ও স্কটল্যান্ডের মধ্যে ৷ ফলাফল ছিল গোলশূন্য ৷ ঠিক হয় মাঠ হবে আয়তাকার ৷ প্রাকৃতিক ৷ পরে বলা হয়েছে কৃত্রিম হলে হবে সবুজ ৷ মধ্যবৃত্তটির ব্যাসার্ধ হবে ৯.১৫ মিটার ৷ প্রত্যেক লাইনের প্রস্থ হবে সমান ৷এরপরে কয়েকবার নিয়মের বদল হয় ৷আন্তর্জাতিক খেলায় মাঠ হবে দৈর্ঘ্যে ১০০-১১০ মিটার ও প্রস্থে ৬৪-৭৫ মিটার ৷ গোল পোস্টের উপরের আড়ার ব্যবহার শুরু হয় ১৮৭৫ সালে ৷ ১৮৭৭ সালে খেলার মাঠের দৈর্ঘ্য এবং ৯০ মিনিট সময় নির্ধারিত হয় ৷ প্রতিটি বার একই প্রস্থের এবং গোলপোস্ট ও ক্রসবারের রঙ সাদা হতে হবে ৷১৮৯০ সালে থেকে গোলপোস্টে জালের ব্যবহার করা হয় ৷ গোলাকার বলের পরিধি ৬৮-৭০ সেমি , ওজন ৪১০-৪৫০ গ্রাম এবং এর ভিতর বাতাসের চাপ ০.৬-১.১ এটমোস্ফিয়ার ঠিক হয় ৷১৮৯১ সালে পেনাল্টি কিক চালু হয় ৷ যাতে বলা হয় পেনাল্টি এরিয়া মার্ক করতে হবে ৷এই মার্ককে কেন্দ্র করে ৯.১৫ মিটার ব্যাসার্ধে বৃত্তচাপ আঁকতে হবে ৷ প্রতিটি কোণে ১ মিটার ব্যাসার্ধের কর্ণার এরিয়া আঁকার কথা বলা হয়েছে ৷সবচেয়ে বির্তকিত “অফসাইড” ৷ তাই ,বলা হয়েছে বল নিয়ে ডিফেন্ডারকে পার হতে হবে কিংবা বল পাস পাওয়ার সময় ডিফেন্ডারের সমান্তরালে বা পিছনে থাকতে হবে ৷১৯০০ সাল থেকে অলিম্পিকে প্রদর্শনী খেলা হিসাবে ফুটবল অঙ্গীভূত হয় ৷ ১৯০৪ সালের ২১মে বর্তমান ফিফা ( FIFA শব্দটির মূল ফরাসি নাম Federation Internationale de Football Association )কাজ শুরু করে ৷ ১৯১৪ খ্রিস্টাব্দের গ্রীষ্মকালীন অলিম্পিকে অনুষ্ঠিত ফুটবল প্রতিযোগিতাকে ‘ অপেশাদার বিশ্ব ফুটবল চ্যাম্পিয়ানশিপ হিসাবে স্বীকৃতি দেয় ৷ ১৯৫১ সালে এই খেলা এশিয়ান গেমসে অন্তর্ভুক্ত হয় ৷ গত ১৪ জুন ২০১৮থেকে পৃথিবীর সর্বকালের সেরা গোলরক্ষক লেভ ইয়াসিনের রাশিয়ায় হয়েছিল বিশ্বকাপ ফুটবল ৷ ঐ আসরে ৩২টি দেশ মূল প্রতিযোগিতায়
অংশ নিয়েছিল ৷ এবার বিশ্বকাপের ২২তম আসর বসবে কাতারে ৷ আমরা দেখতে পাবো পায়ের জাদু ও নানা চমক ৷ সব খেলার সেরা ফুটবলের ৷ঔপনিবেশিক আমলে ভারতে জাতীয়তাবোধের বিকাশে খেলা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করত ৷ ইংরেজদের শ্বেতাঙ্গ ও অশ্বেতাঙ্গ বিভেদ এবং ঔপনিবেশিক নীতি এর কারণ ৷ গোষ্ঠ পাল পান চীনের প্রাচীর বলে পরিচিতি ৷ মোহনবাগানের সন্তোষ দত্ত ক্যালকাটা ক্লাবের উইলিয়ামসনের নাক ভাঙলে এবং তুলসী দত্ত স্যান্ডেমোনিয়াম দলের বিদেশী খেলোয়াড়ের পাঁজরের হাড় ভাঙলে স্বদেশী সমর্থকদের কাছে বীরের সম্মান পান ৷ ১৮৮৯ সালে এই মোহনবাগান ক্লাব প্রতিষ্ঠিত হয় ৷বিশ্বে দ্বিতীয় আই এফ এ শীল্ড শুরু হয় ১৯১১ সালে ৷১৯১১ সালে মোহনবাগান বুট পরা ইংরেজ ইস্ট ইয়র্ক ক্লাবকে খালিপায়ে খেলে হারানোয় ভারতীয় বিশেষত বাঙালীদের মধ্যে প্রবল জাতীয়তবাদ সঞ্চারিত হয় ৷ এর প্রাবল্যে ভীত হয়ে শাসক ইংরেজ কলকাতা থেকে দিল্লীতে রাজধানী স্থানান্তরিত করে ৷

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button