বাংলাদেশ

সংসারের হাল ধরতে অটোরিকশা চালায় শিশু বাঁধন

সংসারের হাল ধরতে অটোরিকশা চালায় শিশু বাঁধন!!

নাম বাঁধন। বয়স এগারো কি বারো। মলিন মুখখানির দিকে তাকালে যে কারও মায়া লাগতে পারে। যে বয়সে হাতে স্কুলবই থাকার কথা, বন্ধুদের সঙ্গে দাপিয়ে বেড়ানোর কথা, খেলাধুলা করার কথা, সে বয়সে কাঁধে তার সংসারের ভার। পেটের তাড়নায় অটোরিকশা নিয়ে ছুটে বেড়াচ্ছেন সড়কের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে। সে-ও স্কুলে পড়ে। তাইতো বন্ধুদের চোখ এড়িয়ে তাকে চালাতে হয় অটোরিকশা। বাঁধন নামের এই শিশুটির জীবনের গল্প এমনই করুণ।

জামালপুরের সরিষাবাড়ী উপজেলার পোগলদিঘা ইউনিয়নের বয়ড়া বাজার এলাকার আবুল কালাম ও শেফালী আক্তার দম্পতির বড় ছেলে বাঁধন। স্থানীয় ১৬ নম্বর পশ্চিম বয়ড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী সে। তবে গত করোনা মহামারি শুরুর পর থেকে সে স্কুলে অনিয়মিত। পরিবারের হাল ধরতে গিয়ে গত কয়েক মাস ধরে তার স্কুলে যাওয়া একেবারেই বন্ধ।

বাঁধনের অটোরিকশায় চড়তে গিয়েই তার সঙ্গে পরিচয় ও কথা। ধূলিজীর্ণ শুষ্ক চোখেমুখে কী এক অদ্ভূত মায়া লেগে আছে। বাঁধন বলে, আগে স্কুলে যাইতাম, এখন যাই না। বাবা অসুস্থ, কামাই করতে পারেন না, ভারী কাজও করতে পারেন না। ভারী কাজ করতে গেলে আব্বা হাফাইয়া ওঠেন। তার সপ্তাহে আটশত টাকার ওষুধ লাগে। তাই আমি গাড়ি চালাই। সারাদিন রিকশা চালাইয়া যা উপার্জন করি, তা দিয়া বাবার ওষুধ এবং সংসার চালাই।

তবে বাঁধনেও মন চায় আর দশজন বন্ধুর মতো সকাল-বিকেল বিদ্যালয়ের প্রাঙ্গণে ছুড়ে বেড়াতে। হইহুল্লোড় করতে। কিন্তু জীবনের বাস্তবতা তার বড়ই প্রতিকূল। সে জানায়, তারও প্রতিদিন স্কুলে যেতে মন চায়, বন্ধু-বান্ধবদের সাথে খেলাধুলা করে সময় কাটাতে ইচ্ছে করে। কিন্তু দিনশেষে বাড়িতে খাবার নিয়ে ফিরতে হবে, এই ভাবনাও থাকে তার। একদিন কামাই না করলে বাবার ওষুধ কেনা হবে না। তাই মনের কথা সে মনেই সুপ্ত থাকে। তবে সুযোগ পেলে সেও পড়ালেখায় মনোযোগী হতে চায়।

কথা হয় বাঁধনের বাবা আবুল কালামের সঙ্গে। তিনি জানান, ছেলে স্কুলে পড়তে চায়, কিন্তু তিনি ছেলেকে নিয়মিত স্কুলে পাঠাতে পারেন না। ছেলে স্কুলে গেলে সংসার চলে না। বাড়িতে ছোট একটি দোকান রয়েছে, তবে দোকানে তেমন একটা মালামাল নেই। টুকটাক যা বেচাকেনা হয়, আর ছেলে যা রোজগার করে তা দিয়ে কোনোরকমে চলে তাদের চারজনে সংসার।

তিনি বলেন, আমি অপারেশনের রোগী, অপারেশনের পর থেকে শরীরে শক্তি পাই না। পাঁচ কেজি জিনিস নিয়েও তিনি বাড়ি আসতে পারি না, হাঁপিয়ে উঠি। তাই বাধ্য হয়ে ছেলেকে কাজে পাঠাই।

বাঁধনের মা শেফালী আক্তার বলেন, দুই বছর ধরে ছেলে পড়ালেখা বাদ দিয়ে অটোরিকশা চালাচ্ছে। করোনার আগে স্কুলে নিয়মিত যাতায়াত করলেও ধীরে ধীরে স্কুলে যাওয়া কমিয়ে দেয়। গত তিনমাস ধরে স্কুলে যাওয়া একেবারে বন্ধ। তবে ছেলেকে কাজে পাঠিয়ে সারাদিন তিনি চিন্তায় থাকেন। কিছুক্ষণ পর পর মোবাইল করে ছেলের খোঁজখবর নেন। সরকার বা ব্যক্তি পর্যায় থেকে কোনো সহায়তা পেলে তিনি ছেলেকে কাজে না পাঠিয়ে স্কুলে পাঠাতে চান।

কথা হয় ১৬ নম্বর পশ্চিম বয়ড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ফরিদা ইয়াসমিনের সঙ্গে। তিনি জানান, ছেলেটা আগে স্কুলে এলেও গত ছয়মাস ধরে একেবারেই স্কুলে আসা বন্ধ। বারবার অভিভাবকের সঙ্গে কথা বলে, বোঝানোর চেষ্টা করেও কাজ হয়নি।

এ বিষয়ে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা নাহিদা ইয়াসমিন বলেন, স্কুলে যদি কোনো ছাত্র-ছাত্রী অনুপস্থিত থাকে তাহলে আমরা নিয়মিত হোম ভিজিট করে থাকি। এছাড়াও যারা স্কুলে নিয়মিত আসা-যাওয়া করে তাদের জন্য সরকার থেকে উপবৃত্তির ব্যবস্থা রয়েছে। তবে বাঁধনের বিষয়টি আমরা দেখবো, কী কারণে সে স্কুল বাদ দিয়ে অটোরিকশা চালাচ্ছে।

সরিষাবাড়ী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) উপমা ফারিসা বলেন, এ ব্যাপারে তাদের অভিভাবকেরা উপজেলা প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ করলে সর্বাত্মক সহযোগিতা করা হবে।।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button